ডিসিসিআইয়ের ইপিআই প্রতিবেদন

ঢাকার মানুষের মাথাপিছু আয় ৫১৬৩ ডলার

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) হিসাব অনুযায়ী ঢাকা জেলার বাসিন্দাদের মাথাপিছু আয় ৫ হাজার ১৬৩ ডলার।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) হিসাব অনুযায়ী ঢাকা জেলার বাসিন্দাদের মাথাপিছু আয় ৫ হাজার ১৬৩ ডলার। দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় যেখানে ২ হাজার ৮২০ ডলার, সেখানে এ পরিমাণ দেশের মানুষের গড় মাথাপিছু আয়ের প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। গতকাল রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রকাশিত অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক বা ইপিআই প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১১ সালে করা জেলাভিত্তিক জিডিপির তথ্যকে ভিত্তি ধরে এ জেলার বিনিয়োগ, ভোগ, ব্যয়, আমদানি, রফতানি, আয়তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রভৃতি বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা জেলার মাথাপিছু আয়ের এ হিসাব অনুমান করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিসিসিআই।

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাস্তব চিত্র নিরূপণ ও উন্নয়নের করণীয় নির্ধারণে প্রথমবারের মতো ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে ডিসিসিআই। এ লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীজনদের মতামত গ্রহণে ‘অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক’ শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনা সভার আয়োজন করে সংস্থাটি। সভায় আরো জানানো হয়, ২০২৫ সালে ইপিআই (অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা জেলার অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে উৎপাদনশীল খাত—প্রায় ৫৬ শতাংশ।

অনুষ্ঠানে সভাপতির স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘দেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ পরিমাপের জন্য স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বেশকিছু সূচকের কার্যক্রম রয়েছে, যদিও এসব সূচক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে এবং কেন পরিবর্তিত হচ্ছে তার প্রকৃত চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ডিসিসিআই অর্থনৈতিক অবস্থান সূচক প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে ইপিআইয়ের কার্যক্রম রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক হলেও পরে ধাপে ধাপে সারা দেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।’

ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ‘ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রকাশিতব্য এ সূচকের মাধ্যমে—বিশেষ করে শিল্প খাতে উৎপাদন, বিক্রি, অর্ডার প্রবাহ, রফতানির প্রবণতা, কর্মসংস্থান, ব্যবসায়িক আস্থা এবং বিনিয়োগের প্রবৃত্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া পাবে। প্রাথমিকভাবে এ সূচকে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য, আবাসন, পরিবহন ও স্টোরেজ এবং ব্যাংক খাতের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআইয়ের মহাসচিব (ভারপ্রাপ্ত) ড. একেএম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী। তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ সময়ে গবেষণাটি পরিচালিত হয়, যেখানে মোট ৬৫৪ জন উত্তরদাতার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে, যার মধ্যে উৎপাদন খাত থেকে ছিলেন ৩৬৫ জন এবং সেবা খাত থেকে ২৮৯ জন।’

আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী জানান, ‘উৎপাদন শিল্পে আটটি খাত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—খাদ্যপণ্য, টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, রাসায়নিক ও উদ্ভিজ্জ পণ্য, রাবার ও প্লাস্টিক, অ-ধাতব খনিজ এবং মৌলিক ধাতু। আর সেবা খাতের মধ্যে পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য, স্থল পরিবহন ও রিয়েল এস্টেট কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’

মূল প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকা জেলার অর্থনীতিতে উৎপাদনশীল খাতের অবদান ৫৬ শতাংশ, ৪৪ শতাংশ সেবা খাতের। এর পরেই রয়েছে খাদ্যপণ্য খাত ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ, বস্ত্র খাত ৯ দশমিক ৩ শতাংশ এবং রাবার ও প্লাস্টিক পণ্য ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া মৌলিক ধাতু খাতের অংশ ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, ওষুধ ও রাসায়নিক খাত ২ দশমিক ৭ শতাংশ, চামড়া ও সংশ্লিষ্ট পণ্য ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং অন্যান্য অ-ধাতব খনিজ পণ্যের অংশ ২ দশমিক ২ শতাংশ।

গবেষণায় দেখা যায়, সেবা খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অংশীদারত্ব রয়েছে পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যে—৬০ দশমিক ২ শতাংশ। এরপর রয়েছে রিয়েল এস্টেট খাত ২০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পরিবহন খাত ১৯ শতাংশ।

গবেষণার বিষয়ে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাত অনেক ধরনের সুবিধা পাচ্ছে, তাই এর সঙ্গে অন্যান্য খাতের তুলনার বিষয়টি তেমন যৌক্তিক নয়।’

ডিসিসিআইয়ের ইনডেক্সের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তথ্য বিশ্লেষণের বিষয়টি শুধু নিজেদের মধ্যে করলে হবে না, আমাদের প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে এর তুলনামূলক মূল্যায়ন জরুরি। অর্থনীতির সব সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা বেশ নাজুক। এর অন্যতম কারণ হলো সরকার প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যক্রমগুলো ভালোভাবে মূল্যায়ন করছে এবং দীর্ঘসূত্রতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ অবস্থা মোকাবেলায় অর্থনৈতিক সংস্কার প্রস্তাবকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।’

অনুষ্ঠানে এসএসজিপির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ নেসার আহমেদ বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণের আগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিদ্যমান সুবিধার বেশির ভাগই বাংলাদেশ ব্যবহার করেছে, তাই এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে এ সুবিধা বাতিল হলে তখনকার পরিবেশ মোকাবেলায় আমাদের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন বলেন, ‘অর্থনীতি, শিল্প খাত, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার ওপর বিদেশী উদ্যোক্তাদের আস্থা থাকলেই বিনিয়োগ প্রাপ্তির পাশাপাশি বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ সম্ভব। কৃষি খাতকেও এ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (এসএমইএসপিডি) নওশাদ মোস্তফা বলেন, ‘এসএমইদের জন্য নীতিমালা এরই মধ্যে বেশ সহজীকরণ করা হয়েছে, তবে ঋণ প্রাপ্তিতে কী ধরনের সমস্যা পরিলক্ষিত হচ্ছে, উদ্যোক্তাদের থেকে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সে অনুযায়ী উদ্যোগ নেয়া সহজ হবে।’

অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পরিচালিত গবেষণার কার্যপদ্ধতি সংশোধন করার পরামর্শ দেন র‍্যাপিডের গবেষণা পরিচালক ড. মো. দীন ইসলাম। আর দেশের বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের সঙ্গে ঢাকা চেম্বারের গবেষণার তথ্য সমন্বয়ের ওপর জোরারোপ করেন বিএফটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. সাইফ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘সেই সঙ্গে এ গবেষণায় খাতভিত্তিক আরো বহুমুখী তথ্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে।’

আরও